চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) মূল্যবান আবাসিক প্লট বরাদ্দকে কেন্দ্র করে এক ভয়াবহ জালিয়াতির চিত্র উঠে এসেছে। ক্ষমতার অপব্যবহার, নীতিমালার তোয়াক্কা না করা এবং বেনামি লেনদেনের মাধ্যমে সরকারি সম্পদ আত্মসাতের এই মহোৎসবে নাম জড়িয়েছে খোদ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও সাবেক জনপ্রতিনিধির। অনুসন্ধানে জানা গেছে, চউকের সাবেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও বর্তমান চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন এবং চউকের সাবেক প্রভাবশালী বোর্ড সদস্য ও হাটহাজারী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ইউনুস গণি চৌধুরী পরস্পর যোগসাজশে এই জালিয়াতি সম্পন্ন করেছেন।
নেপথ্যে ‘বিশেষ বিবেচনা’র নামে লুটপাট;
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত নথি বলছে, ২০০৮ সালে অনুমোদিত অনন্যা আবাসিক প্রকল্পের মূল নীতিমালায় ‘বিশেষ বিবেচনা’ বলে কোনো কোটা ছিল না। কিন্তু ২০১৩ সালের ২১ অক্টোবর চউকের ৪০৫তম বোর্ড সভায় ক্ষমতার দাপটে এই নতুন ক্যাটাগরি যুক্ত করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক আশীর্বাদপুষ্টদের প্লট উপহার দেওয়া। এই তালিকার ৫২ নম্বরে নাম ওঠে তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আশরাফুল আমিনের। আইনানুযায়ী সরকারি প্লট বরাদ্দের আগে অন্তত চারটি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, ‘উচ্চপদস্থ ব্যক্তি’ ও ‘প্লট কম’ হওয়ার দোহাই দিয়ে গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়, যা সাধারণ মানুষের প্রতিযোগিতার অধিকারকে সরাসরি হরণ করেছে।
বেনামি লেনদেন: জাকিয়া বেগমের নামে হস্তান্তর নিয়ে আইনজ্ঞদের মত, এটি ‘বেনামি লেনদেনের’ একটি ধ্রুপদী উদাহরণ। চউকের বোর্ড সদস্য হিসেবে ইউনুস গণি সরাসরি নিজের নামে প্লট নিতে পারতেন না। ফলে তিনি আশরাফুল আমিনকে ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করেন।
নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়:
২১ নভেম্বর ২০১৩: অনন্যা আবাসিক এলাকায় ৩.৮০ কাঠার ডি-৩১৪এ নম্বর প্লটটি আশরাফুল আমিনের নামে বরাদ্দ হয় (মূল্য ২২.৮০ লক্ষ টাকা)।
১১ এপ্রিল ২০১৬: আশরাফুল আমিন লিজ এগ্রিমেন্ট সম্পন্ন করেন।
১১ আগস্ট ২০১৬: মাত্র ৪ মাসের মাথায় প্লটটি ইউনুস গণি চৌধুরীর স্ত্রী জাকিয়া বেগমের নামে রেজিস্ট্রি করে দেন। বাজারদরের চেয়ে অনেক কম মূল্যে (৩৪.২০ লক্ষ টাকা) এই হস্তান্তরের বিষয়টিই প্রমাণ করে যে, এটি একটি সাজানো নাটক ছিল। স্থানীয়দের মতে, ওই এলাকায় প্রতি কাঠার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২৫-৩০ লক্ষ টাকা।
আশরাফুল আমিন লিজ নেওয়ার সময় হলফনামায় ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, চট্টগ্রাম শহরে তার বা পরিবারের নামে কোনো প্লট নেই এবং এটি তিনি আবাসিক প্রয়োজনে ব্যবহার করবেন। কিন্তু লিজ গ্রহণের কয়েক মাসের মধ্যেই তা হস্তান্তর করে তিনি সরাসরি নীতিমালার লঙ্ঘন করেছেন। আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, আবাসিক প্রয়োজনে নেওয়া এই প্লটটিকে পরবর্তীতে বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়। ২০২৩ সালের ৫ এপ্রিল জাকিয়া বেগম এই প্লটটি ইসলামী ব্যাংকের অনুকূলে বন্ধক রেখে বাণিজ্যিক ঋণ নেওয়ার জন্য চউক থেকে ছাড়পত্র গ্রহণ করেন।
আশরাফুল আমিনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য; প্লট জালিয়াতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন দাবি করেন, অর্থের অভাবে তিনি কোনো প্লটই গ্রহণ করেননি। তবে ফতেয়াবাদ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ১১ আগস্ট ২০১৬ তারিখের দলিল নং-২৭৬০ তার এই দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণ করে। দলিলে স্পষ্টভাবে তার স্বাক্ষর ও হস্তান্তরের প্রমাণ রয়েছে।
দুদকের জালে আশরাফুল, কেবল চউকের প্লট নয়, বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনে (বিএসসি) কর্মরত থাকাকালীনও তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে গত ২২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তিন সদস্যের একটি তদন্ত টিম গঠন করেছে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি তাকে সশরীরে তলব করা হয় এবং বর্তমানে নথিপত্র যাচাইয়ের কাজ চলছে।
আইনজ্ঞরা বলছেন, দণ্ডবিধির ৪২০ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা অনুযায়ী অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ডসহ প্রশাসনিক শাস্তির বিধান রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে কি না।