কোনো সরকারি পতাকা, পুলিশ প্রটোকল কিংবা সরকারি দেহরক্ষী নেই—একেবারে সাধারণ একজন নাগরিকের মতো ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে সাভারের আমিনবাজার ও আশুলিয়া রাজস্ব সার্কেল কার্যালয়ে সোমবার আকস্মিক পরিদর্শনে হাজির হলেন ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল। আর প্রতিমন্ত্রীর এমন ঝটিকা সফরেই বেরিয়ে এলো দুই কার্যালয়ের সেবা কার্যক্রম, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার নানা অনিয়ম ও চরম ঘাটতির চিত্র।
পরিদর্শনের শুরুতে আমিনবাজার সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহাদাত হোসাইন খান নিজেই নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিত ছিলেন না। প্রতিমন্ত্রী কার্যালয়ে পৌঁছানোর প্রায় ১৫–২০ মিনিট পর তিনি অফিসে আসেন। শুধু তাই নয়, অফিসের ৮ জন কর্মকর্তার মধ্যে নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ২ জন—একজন সার্ভেয়ার ও একজন নামজারি সহকারী। বাকিদের কোনো হদিস ছিল না।
এ সময় অফিসের বাইরে অপেক্ষমাণ কয়েকজন সেবাপ্রার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রীকে জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে ভূমি অফিসে এসেও কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে ঘুরে যাচ্ছেন। সেবাপ্রার্থীদের মুখে এই ভোগান্তির কথা শুনে এবং সেবা প্রদানে দীর্ঘসূত্রতা দেখে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন ভূমি প্রতিমন্ত্রী। এরপর তিনি নিজে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে কর্মকর্তাদের উপস্থিতির প্রকৃত সময় যাচাই করেন এবং তথ্য কেন্দ্র-কাম-হেল্প ডেস্কের দুর্বল অবকাঠামো ও নাজুক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
তবে রেকর্ড কিপিং ও ডেটা এন্ট্রি টিমের ক্ষেত্রে কিছুটা ইতিবাচক চিত্র দেখা গেছে। প্রতিমন্ত্রী একাধিক রেকর্ড রুম ঘুরে দেখার পাশাপাশি এই ইউনিটের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেন। তারা যথাসময়ে উপস্থিত ছিলেন এবং তাদের কার্যক্রম চলমান ছিল।
পরিদর্শনকালে কর্মকর্তারা জানান যে, সার্ভার সমস্যার কারণে মিউটেশন (নামজারি) কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জনগণের সেবায় এমন উদাসীনতা ও প্রযুক্তিগত গাফিলতি দেখে প্রতিমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে সার্ভার-সংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত দায়িত্বপ্রাপ্তদের ‘শোকজ’ (কারণ দর্শানোর নোটিশ) করার নির্দেশ দেন। একই সাথে তিনি তথ্যকেন্দ্রকে ডেডিকেটেড জনবল দিয়ে পরিচালনা করার এবং সময়ের চেয়ে সেবার মান ও কার্যকারিতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দেন।
আমিনবাজারের পর প্রতিমন্ত্রী আশুলিয়া রাজস্ব সার্কেল (পলাশবাড়ী), সাভার কার্যালয় পরিদর্শনে যান। সেখানে গিয়ে কার্যালয় সংলগ্ন এলাকায় লাইসেন্সবিহীন অবৈধ নামজারি কার্যক্রম এবং বেশ কিছু অবৈধ দোকানপাট তার নজরে আসে। সরকারি অফিসের নাকের ডগায় এমন অবৈধ কর্মকাণ্ড দেখে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে বিষয়টি অবহিত করেন এবং এসব অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কঠোর নির্দেশ দেন।
ভূমি প্রতিমন্ত্রীর এই আকস্মিক পরিদর্শনে আমিনবাজার ও আশুলিয়া—উভয় রাজস্ব সার্কেলেরই সেবাদান ব্যবস্থাপনা, উপস্থিতি শৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে একাধিক অনিয়ম, অবহেলা ও ঘাটতির বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। সরকারি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে আগামীতে এমন কঠোর তদারকি বজায় থাকবে বলে জানা গেছে।