মঙ্গলবার, ২১শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী চেতনার পুনর্জাগরণ

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী চেতনার পুনর্জাগরণ

বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত নভেম্বর মাস। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। যে দিনটির মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ নতুন পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার সুযোগ লাভ করে। যে দিনটি না এলে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিলীন হয়ে যেত। সেদিন সেনাবাহিনীর সাহসী সদস্যদের একটি পদক্ষেপে বদলে যায় এ দেশের ভবিষ্যৎ। দিনটি বাংলাদেশের মানুষের কাছে “জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস” নামে পরিচিত। এ দিনটি ছিল সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটানোর একটি দিন। একই সঙ্গে এটি ছিল বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী চেতনার পুনর্জাগরণের সূচনা।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের জনগণ প্রত্যাশা করেছিল স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের মেলবন্ধন ঘটবে। কিন্তু ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সময়কালে দেশ গভীর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও প্রশাসনিক দুর্নীতিতে জর্জরিত হয়। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে “বাকশাল” প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু হয়, ফলে স্বাধীনতাপ্রিয় বাংলাদেশের মানুষ রাজনৈতিকভাবে বঞ্চিত ও অসন্তুষ্ট হয়ে পড়ে। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবার নিহত হওয়ার পর দেশের রাজনীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত হয়। এরপর থেকে চলতে থাকে সামরিক গোষ্ঠী ও প্রশাসনিক শক্তির মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে স্বাধীনতার ঘোষক ও সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করেন। এতে করে সেনাবাহিনীর ভেতরে মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভ ও অসন্তোষ জন্ম নেয়। এর ভেতরে চলে ক্ষমতা দখলের লড়াই। অস্থির হয়ে উঠে সদ্য জন্ম নেওয়া নবজাতক বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ সমুন্নত রাখতে দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে এগিয়ে আসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাহসী সৈনিকেরা। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ভোরে ঢাকা সেনানিবাসে শুরু হয় সাধারণ সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধাদের এক স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন, যা দ্রুত জনগণের অংশগ্রহণে রূপ নেয়। “সৈনিক-জনতার ঐক্য অটুট থাকুক” এই শ্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন সেনানিবাস ও শহর। এ সময় বিপ্লবী সেনা সদস্য ও জনতা ক্ষমতা দখলকারী মুজিবপন্থী খালেদ মোশাররফের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে নিয়ে আসেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে। অস্থির পরিস্থিতিতে দেশ ও জাতির হাল ধরার জন্য সাহসী সেনাদের ভরসা জিয়াউর রহমানকেই দেওয়া হয় বিলীন হতে চলা বাংলাদেশের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে অর্পিত হয়।

এদিন থেকেই ঘুরে যায় বাংলাদেশের ভাগ্যের চাকা। শুরু হয় নতুন পরিচয়ে দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নেওয়ার এক স্বপ্নযাত্রা। “ক্ষমতা নয়, জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস” এই নীতি ধারণ করে শুরু হয় নতুন পথচলা। জন্ম নেয় জিয়াউর রহমানের হাত ধরে “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ” ধারণা। “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ” ধারণার মূল দর্শন ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের ভিত্তিতে একটি স্বকীয় জাতীয় চেতনা গড়ে তোলা। জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন, স্বাধীনতা শুধু ভৌগোলিক নয়; বরং একটি জাতির আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার সম্মিলিত রূপ। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাতীয় পরিচয়কে শুধু ভাষাভিত্তিক বা জাতিগত পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার প্রবণতা বাংলাদেশকে সংকীর্ণতার দিকে ঠেলে দিচ্ছিল। শহীদ জিয়া এই সংকীর্ণতার জাল ছিঁড়ে ঘোষণা করেন “আমরা বাংলাদেশি।” এই ঘোষণা প্রতিটি নাগরিককে একই পতাকার নিচে একত্রিত করে। এই দর্শনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। বিএনপির রাজনৈতিক আদর্শের মূল ভিত্তি ছিল চারটি ১. বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ: নাগরিক পরিচয়, ভৌগোলিক ঐক্য ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর ভিত্তি করে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা। ২. গণতন্ত্র: জনগণ হবে ক্ষমতার উৎস, নির্বাচন হবে সরকারের বৈধতার একমাত্র ভিত্তি। ৩. অর্থনৈতিক মুক্তি ও উন্নয়ন: গ্রামোন্নয়ন, কৃষি বিপ্লব, স্বনির্ভরতা ও শিল্পায়নকে রাষ্ট্রের অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে গ্রহণ। ৪. আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও কূটনীতি: বাংলাদেশ থাকবে নিরপেক্ষ, তবে সার্বভৌম ও মর্যাদাবান—কোনো শক্তির মুখাপেক্ষী হয়ে নয়।

৭ নভেম্বরের ঘটনা তাই কেবল একটি সামরিক অভ্যুত্থান ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে পুনরায় বিশ্বাস স্থাপনের সূচনা। এই দিনটির মাধ্যমে সেনাবাহিনী ও সাধারণ জনগণের মধ্যে ঐক্যের প্রতীকী সংযোগ গড়ে ওঠে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য জাতীয় সংহতির প্রয়োজনীয়তা প্রমাণিত হয়। বাংলাদেশে নতুন জাতীয় দর্শন ও রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তি রচিত হয়। এ দিনটি জাতির ঐক্য, আত্মনির্ভরতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। “একটি জাতি কেবল তখনই টিকে থাকে, যখন তার জনগণ নিজস্ব চেতনা ও ঐক্যের ভিত্তিতে দাঁড়ায়।”

বাংলাদেশ যখন জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখনই একদল বিপথগামী সেনা সদস্যের হাতে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে শহীদ হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। অতি অল্প সময়ে দেশ পরিচালনা করে তিনি এতটাই জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হয়েছিলেন যে, সেদিন তাঁর জানাজায় জনগণের উপস্থিতি প্রমাণ করেছিল তাঁর প্রতি ভালোবাসার গভীরতা। জিয়াউর রহমানের পর বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী চেতনা ধারণ করে তাঁরই সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে এগিয়ে নিচ্ছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি নতুন প্রজন্মকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করছেন এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব হিসেবে নিজের অবস্থান দৃঢ় করছেন। তারেক রহমান বারবার ঘোষণা করেছেন “বাংলাদেশ কারো দান নয়, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ফসল।” এই বক্তব্যের মধ্য দিয়েই তিনি প্রমাণ করেছেন যে, জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ আজও সমকালীন প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক এবং অপরিহার্য।

লেখক:
সাংবাদিক ও ক্রীড়া সংগঠক
মুঠোফোন : ০১৮৩৩০০৫৫০৭

[print_link]

WhatsApp
Facebook
X
LinkedIn
Email
Telegram