বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য, স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের সাব- সেক্টর কমান্ডার সাবেক এমপি ও মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ইন্তেকাল করেছেন।
আজ বুধবার (১৩ মে,২০২৬ খ্রিঃ) সকাল সোয়া ১০ টায় রাজধানী ঢাকার স্কয়ার হাসপাতা¡লে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।
রাজনৈতিক জীবনে তিনি জাতীয় সংসদের চট্টগ্রাম -১ মীরসরাই সংসদীয় আসন থেকে ৭ বার জাতীয় সংসদ সদস্য ও একাধিকবার বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র কেবিনেট মন্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৪৩ সালের ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ধুম ইউনিয়নের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। তিনি চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং কানুগোপাড়া স্যার আশুতোষ সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরে ১৯৬৬ সালে পাকিস্তানের লাহোরের ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্রজীবনেই তিনি বঙ্গবন্ধু ঘোষিত “বাঙালির মুক্তি সনদ ছয় দফা” আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং পশ্চিম পাকিস্তানে অধ্যয়নরত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। দেশে ফিরে তিনি চট্টলশার্দূল এম.এ আজীজের হাত ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর পরম স্নেহ ও আনুকূল্য লাভ করেন।
তিনি ১৯৭০ সালে প্রথমবার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম -১ মীরসরাই আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ১ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রতিরোধে ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কের শুভপুর সেতু উড়িয়ে দেওয়ার অভিযানে সফলভাবে নেতৃত্ব দেন। তিনি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হয়েও ভারতে সশস্ত্র ট্রেনিং শেষে দেশের অভ্যন্তরে পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন গেরিলা অভিযানে অংশ নেন। তৎমধ্যে চট্টগ্রাম ইষ্টার্ণ রিফাইনারী, সীতাকুন্ডের কেমিক্যাল কমপ্লেক্সে গেরিলা অপারেশন উল্লেখযোগ্য।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম ছিলেন তিনি। ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় হুইপ এবং ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৫ সালেও তিনি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী হিসেবে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। গৃহায়ণ মন্ত্রী হিসেবে তিনি বাংলাদেশের আবাসন শিল্পের বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন। দেশের অনেক মেগা প্রকল্পের কাজ তাঁর নেতৃত্বে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বিমান মন্ত্রী হিসেবে তাঁর দায়িত্বকালীন সময়ে সফলতার সাথে দ্রুততম সময়ে পূর্ণতা পায়। চট্টগ্রামের উন্নয়নে তাঁর এই অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
দলীয় রাজনীতিতে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকান্ডের পরবর্তীতে চরম বৈরী সময়ে তিনি চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক, পরবর্তীতে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ১৯৯২ সালে সভাপতি নির্বাচিত হয়ে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দুইবার প্রেসিডিয়াম সদস্য নির্বাচিত হন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সর্বশেষ জাতীয় সম্মেলনে তিনি ১ নং প্রেসিডিয়াম সদস্য নির্বাচিত হয়ে আমৃত্যু নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
তাঁর পিতা মরহুম এস. রহমান ছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। তিনি ‘ওরিয়েন্ট বিল্ডার্স কর্পোরেশন’ এবং কক্সবাজারের ঐতিহ্যবাহী ‘হোটেল সায়মন হেরিটেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন।
পৈতৃক সূত্রে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। ১৯৮৩ সালে তিনি ‘গ্যাসমিন লিমিটেড’ নামে একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ও কনস্ট্রাকশন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এছাড়া তিনি ‘দ্য পেনিনসুলা চিটাগাং’ হোটেল এবং কক্সবাজার সায়মন বীচ হোটেলের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ছিলেন। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশে তিনি অনন্য অবদান রেখেছেন।
রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার হামলা ও নির্যাতনের শিকার হন তিনি। ১৯৮০ সালে চট্টগ্রামের নিউমার্কেট এলাকায় হরতালের সমর্থনে আওয়ামী লীগের মিছিলে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হামলায় তিনি গুরুতরভাবে আহত হন। এসময় সন্ত্রাসীরা তাঁর পায়ের রগ কেটে দেয়। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামের লালদীঘিতে শেখ হাসিনার জনসভায় চালানো গণহত্যায় তিনি নেত্রীর সাথে থেকে গুরুতর আহত হন। ১৯৯২ সালের ৮ মে ফটিকছড়িতে ছাত্রলীগের সম্মেলন থেকে ফেরার পথে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হয়ে গুরুতর আহত হন। এদিন তিনি সন্ত্রাসীদের ব্রাঁশফায়ার থেকে অলৌকিক ভাবে বেঁচে যান।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকান্ডের পর তিনি আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করতে দুঃসাহসী ভূমিকা পালন করেন। দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছেন। নির্যাতন,একাধিকবার জেল- জুলুমের শিকার হয়েও তিনি রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। সেনা সমর্থিত ওয়ান ইলেভেন সরকারের সময় তিনি প্রায় দীর্ঘ দুই বছর কারাভোগ করেন। তিনি তখনকার ক্ষমতাসীনদের “মাইনাস টু ফর্মূলা তথা বিরাজনীতিকরণের” বিরুদ্ধে উচ্চকন্ঠ ছিলেন। তিনি দুদক অফিসে সম্পদের হিসেব দিতে গিয়ে মিডিয়ায় কাছে দাবি করেছিলেন ; “রাজনৈতিক নেতাদের সম্পদের হিসেব নেয়ার পাশাপাশি যেসব রাজনীতিবিদ পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে রাজনীতি করেছেন তাদের হিসেবটাও নেয়া হোক”।
তিনি দেশের অন্যতম বৃহৎ মীরসরাই মহামায়া কৃষি সেঁচ প্রকল্পের স্বপ্নদ্রষ্টা ও বাস্তবায়নকারী। এছাড়াও তাঁর সূদূর প্রসারী চিন্তার ফসল হিবেবে দেশের বৃহত্তম মীরসরাই উপকূলবর্তী অঞ্চলে “ইকনোমিক জোন” প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
সন্ত্রাসবিরোধী,অসাম্প্রদায়িক ও উদার প্রগতিশীল ব্যক্তিত্বের অধিকারী এই রাজনীতিক চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষকে ভীষণভাবে ভালোবাসতেন। চট্টগ্রামের উন্নয়নে তিনি সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন। চট্টগ্রাম ডিসি হিলে ভ্রমণকারীদের জন্য সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়ন তাঁর একান্ত আগ্রহে করা হয়। তিনি চট্টগ্রামে থাকলেই এখানে প্রাতঃ ও বৈকালিক ভ্রমণ করতেন। চট্টগ্রামের জাম্বুরি পার্ক উন্নয়ন সহ সারাদেশে অসংখ্য পার্ক স্থাপণ করেন। এছাড়াও তিনি ঢাকায় রমনা পার্ককে অবৈধ দখলমুক্ত করে তা’ পরিকল্পিত ভাবে নাগরিক বান্ধব ভাবে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেন।
তাঁর পিতা মরহুম এস. রহমান ও তিনি মীরসরাইয়ের অসংখ্য স্কুল কলেজ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও দাতা। এই অঞ্চলের শিক্ষার প্রসারে তাঁর পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি নিরেট সাদামাটা মহিয়সী স্ত্রী আয়েশা সুলতানার সঙ্গে সংসার জীবন কাটিয়েছেন ।
তাঁদের তিন ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।মেজ ছেলে মাহবুবুর রহমান রুহেল দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মীরসরাই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের মৃত্যুতে, দলমত নির্বিশেষে চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। চট্টগ্রাম উত্তর, দক্ষিণ জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। নেতৃবৃন্দ বলেন,চট্টগ্রামবাসী একজন অভিভাবকতূল্য রাজনীতিবিদ হারালো। দেশ হারালো এক দেশপ্রেমিক বীর সন্তান। বঙ্গবন্ধুর নীতি আদর্শে অবিচল থেকে তিনি সংগঠন,দেশ ও জনগণের কল্যাণে আমৃত্যু কাজ করে গেছেন।

