ঢাকাশুক্রবার, ১১ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

নারী তরুণদের চোখে বিএনপির রাজনীতি, প্রত্যাশা ও আগামীর বাংলাদেশ!

শিরিন আক্তার আইভি
সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬ ৭:৩৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

নিরাপত্তার নিশ্চয়তায় স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে যাবার অধিকার আমার মনে হয় নারীদের সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ! একটি মেয়ের সকাল কেমন হবে? এই প্রশ্নের মধ্যেও রাজনীতি লুকিয়ে থাকে।সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে সে বাসে উঠবে। কর্মজীবী তরুণীটি অফিসে যাওয়ার জন্য রাস্তায় বের হবে। কেউ হয়তো নিজের ব্যবসার কাজে, কেউ চাকরির পরীক্ষায় বসবে, কেউ সন্তানকে স্কুলে দিয়ে নিজের কর্মস্থলের পথে হাঁটবে। তাদের প্রত্যেকের জীবনে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত কোনো না কোনোভাবে এসে পৌঁছায়।

তাই তরুণ নারীদের কাছে রাজনীতি শুধু নির্বাচন, দল কিংবা ক্ষমতার পরিবর্তনের গল্প নয়। রাজনীতি মানে, নিরাপত্তা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, মর্যাদা এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিজে বেছে নেওয়ার অধিকার।এই জায়গা থেকেই বিএনপির বর্তমান নারী-বান্ধব রাজনীতিকে দেখার প্রয়োজন।
বিএনপির ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নারী পরিবারের প্রধানের নামে ফ্যামিলি কার্ড, মেয়েদের স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার প্রতিশ্রুতি, নারীর কর্মসংস্থান ও সামাজিক উন্নয়ন, এসব বিষয় সেখানে স্থান পেয়েছে।
কিন্তু রাজনীতির সবচেয়ে সুন্দর প্রতিশ্রুতিও শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনে এসে পরীক্ষা দেয়। আর সেখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কী বলা হয়েছে? এবং কী বাস্তবে করা হচ্ছে।

পিংক বাস: নিরাপদ পথের প্রথম দৃশ্যমান পদক্ষেপ
নারীর নিরাপদ চলাচল নিয়ে আমাদের সমাজে আলোচনা নতুন নয়। কিন্তু ২০২৬ সালের আগস্টে ঢাকায় BRTC-এর নারী-নির্ধারিত ‘পিংক বাস সার্ভিস’ চালু হওয়া সেই আলোচনায় একটি নতুন বাস্তব মাত্রা যোগ করেছে। এটি শুধু নারীদের জন্য আলাদা বাসের উদ্যোগ নয়, নারী চালক ও নারী কর্মীদের গণপরিবহন ব্যবস্থায় দৃশ্যমান করে তোলার দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকায় এই সেবা চালুর পাশাপাশি চট্টগ্রাম ও বগুড়াতেও তা বিস্তারের উদ্যোগের কথা এসেছে। একজন তরুণীর কাছে এর অর্থ তাই শুধু ‘নিরাপদে বাসে ওঠা’ নয়। এর মধ্যে আরেকটি বার্তাও আছে, নারী শুধু যাত্রী হবেন না, তিনি চালকের আসনেও বসতে পারেন।
একজন নারী যদি নিরাপদে কর্মস্থলে যেতে পারেন আবার অন্য একজন নারী যদি সেই বাসটি চালিয়ে নিজের জীবিকা অর্জন করতে পারেন, তাহলে একই উদ্যোগের মধ্যে নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান, দুটো সম্ভাবনাই তৈরি হয়।তবে পিংক বাসকে সফল করতে হলে এর পরিধি আরও বাড়াতে হবে। রাজধানীর পাশাপাশি জেলা শহর, উপজেলা ও গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক রুটেও নিরাপদ গণপরিবহন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ নারীর নিরাপত্তা শুধু বাসের ভেতরে নয়, বাসস্টপ থেকে গন্তব্য পর্যন্ত পুরো পথের নিরাপত্তার সঙ্গেই জড়িত।

ফ্যামিলি কার্ড – পরিবারের অর্থনীতিতে নারীর হাতে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, নারীর ক্ষমতায়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা অর্থনীতি।ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, কার্ডটি মা বা পরিবারের নারী প্রধানের নামে দেওয়ার ব্যবস্থা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চে এর পাইলট কার্যক্রম শুরু হয় এবং প্রথম ধাপে ৩৭,৫৬৭ নারী ফ্যামিলি কার্ড পেয়েছেন। প্রত্যেক উপকারভোগী পরিবারকে মাসে ২,৫০০ টাকা সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এখানে একটি প্রতীকী পরিবর্তনও আছে। রাষ্ট্র যখন পরিবারের সামাজিক নিরাপত্তার সহায়তা সরাসরি নারীর নামে পৌঁছে দেয়, তখন নারী শুধু পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে নয়, পরিবারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার একজন স্বীকৃত অংশীদার হিসেবেও দৃশ্যমান হন।
তবে তরুণ নারীদের প্রত্যাশা এখানেই থেমে নেই। তাঁরা শুধু সহায়তা চান না, তাঁরা চান নিজের আয়। চান দক্ষতা উন্নয়ন, সহজ অর্থায়ন, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ, ডিজিটাল ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং, প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ এবং নিজের উপার্জনের ওপর নিজের সিদ্ধান্তের অধিকার। কারণ ভাতা একজন নারীকে একটি সময়ের জন্য সহায়তা করতে পারে; কিন্তু দক্ষতা ও কর্মসংস্থান তাঁকে দীর্ঘমেয়াদে আত্মনির্ভর করে।

শিক্ষা: একজন নারীর হাতে সবচেয়ে শক্তিশালী সম্পদ হলো শিক্ষা। বিএনপির ইশতেহারে মেয়েদের স্নাতকোত্তর পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং কর্মসংস্থানের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আজকের তরুণী শুধু সার্টিফিকেট চান না। তিনি চান এমন শিক্ষা, যা তাঁকে চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় সক্ষম করবে এমন দক্ষতা, যা তাঁকে চাইলে নিজের উদ্যোগ দাঁড় করানোর শক্তি দেবে। একটি মেয়ে যখন উচ্চশিক্ষা পায়, তখন শুধু তার নিজের জীবন বদলায় না, তার পরিবার, ভবিষ্যৎ সন্তান এবং শেষ পর্যন্ত সমাজও বদলায়। তাই নারীর শিক্ষা কোনো ‘নারী কল্যাণ কর্মসূচি’ নয়, এটি জাতীয় উন্নয়নের বিনিয়োগ।

কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্য খাতে নারীর নতুন সম্ভাবনা
বিএনপির ইশতেহারে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সমন্বিত কর্মসূচির প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। নারীদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য খাত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ নারীরা এই খাতে ইতিমধ্যেই বড় ভূমিকা রাখছেন।
কিন্তু চাকরি সৃষ্টি করাই শেষ কথা নয়। একজন নারী যেন কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ, নিরাপদ পরিবেশ, মর্যাদা এবং ন্যায্য পারিশ্রমিক পান, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপির নারী-সংক্রান্ত পরিকল্পনায় কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য তহবিল এবং মাতৃত্বকালীন সুবিধা বৃদ্ধির মতো বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। একজন নারীকে কর্মজীবী হতে বলা সহজ কিন্তু এমন কর্মপরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তিনি একই সঙ্গে কর্মী, মা এবং একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে সম্মান নিয়ে বাঁচতে পারেন, সেটিই আসল পরীক্ষা।

নিরাপত্তা: পিংক বাস থেকে পুরো সমাজ পর্যন্ত
নারীর নিরাপত্তাকে শুধু গণপরিবহনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। একজন নারী বাসে নিরাপদ, কিন্তু রাস্তায় হয়রানির শিকার তাহলে নিরাপত্তা পূর্ণ হলো না। কর্মস্থলে নিরাপদ, কিন্তু অনলাইনে সাইবার হয়রানির শিকার তাহলেও নিরাপত্তা পূর্ণ হলো না। বিএনপির ঘোষিত পরিকল্পনায় নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, পাচার ও যৌতুকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তরুণ নারীদের প্রত্যাশা তাই স্পষ্ট, আইন শুধু কাগজে থাকবে না, প্রয়োগও হবে। দ্রুত বিচার, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, কার্যকর তদন্ত এবং অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, এসব নিশ্চিত না হলে নারীবান্ধব রাষ্ট্রের ধারণা পূর্ণতা পাবে না।

সম্পত্তির অধিকার: যে প্রশ্নটি আরও গভীরভাবে ভাবতে হবে,নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের আলোচনায় সম্পত্তির অধিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি একটি দাবি ছড়িয়েছে, ছেলে না থাকলে কন্যারা বাবার পুরো সম্পত্তি পাবেন। বিষয়টি নিয়ে সতর্ক হওয়া জরুরি। বর্তমান মুসলিম উত্তরাধিকার ব্যবস্থার সাধারণ নিয়মে শুধু ছেলে না থাকলেই কন্যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাবার পুরো সম্পত্তির মালিক হন না। কন্যার নির্ধারিত অংশ এবং অন্যান্য উত্তরাধিকারীর উপস্থিতির ওপর সম্পত্তি বণ্টনের হিসাব নির্ভর করে। কিন্তু এই আলোচনাই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যৎ প্রশ্ন সামনে আনে। একজন নারী যদি শিক্ষা অর্জন করেন, কর্মক্ষেত্রে অবদান রাখেন, পরিবার চালান, ব্যবসা করেন এবং রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে অংশ নেন, তাহলে তাঁর অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্নও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে থাকা উচিত।

তরুণ নারীরা তাই জানতে চাইতেই পারেন, নারীর সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার অধিকারকে আরও ন্যায়সংগত ও কার্যকর করার বিষয়ে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় নীতি কী হবে? এই প্রশ্নটি কোনো দলের বিরুদ্ধে নয়; বরং নারীর ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি প্রয়োজনীয় প্রশ্ন। রাজনীতিতে নারী: ভোটার নয়, সিদ্ধান্তের অংশীদার, নারীর ক্ষমতায়ন তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন নারী শুধু ভোট দেওয়ার লাইনে থাকবেন না, সিদ্ধান্ত নেওয়ার টেবিলেও থাকবেন। সংসদ, স্থানীয় সরকার, দলীয় নেতৃত্ব, নীতি নির্ধারণ, সব জায়গাতেই যোগ্য নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ নারীর জীবন নিয়ে যে নীতি তৈরি হবে, সেখানে নারীর অভিজ্ঞতা ও কণ্ঠ থাকা স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়। তরুণ নারীরা তাই এমন রাজনীতি চান, যেখানে তাঁদের পরিচয় শুধু ‘নারী ভোটার’ নয়, বরং নাগরিক, পেশাজীবী, উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী, নেতা এবং নীতিনির্ধারক হিসেবে স্বীকৃত হবে।

শেষ কথা: নারী করুণা চান না, চান সুযোগ। একজন তরুণী এমন বাংলাদেশ চান না, যেখানে প্রতিদিন তাঁকে বলা হবে, “তুমি নারী, তাই তোমাকে রক্ষা করতে হবে।” তিনি এমন বাংলাদেশ চান, যেখানে রাষ্ট্র বলবে, “তুমি নারী, তাই তোমার পথ নিরাপদ হবে। তোমার শিক্ষা থেমে থাকবে না। তোমার শ্রমের ন্যায্য মূল্য থাকবে। তোমার স্বপ্নের সামনে দরজা বন্ধ থাকবে না। আর তোমার ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তোমার নিজের থাকবে।”

তবে রাজনীতির ভাষায় নারীকে নিয়ে যত প্রতিশ্রুতিই লেখা হোক, তার সত্যতা শেষ পর্যন্ত মাপা হবে খুব সাধারণ কিছু দৃশ্যে। একজন মেয়ে সন্ধ্যায় কতটা নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরতে পারেন। একজন মা নিজের নামে পাওয়া সহায়তা দিয়ে পরিবারের সিদ্ধান্তে কতটা ভূমিকা রাখতে পারেন। একজন তরুণী নিজের যোগ্যতায় চাকরি বা ব্যবসা দাঁড় করাতে পারেন কি না। একজন নারী অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রের কাছ থেকে ন্যায়বিচার পান কি না। আর সবচেয়ে বড় কথা, একজন কন্যা তার নিজের স্বপ্নের মালিক হতে পারেন কি না। তরুণ নারীরা আর করুণার রাজনীতি চান না। তাঁরা চান সুযোগের রাজনীতি! যেখানে নিরাপত্তা হবে অধিকার, শিক্ষা হবে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান হবে স্বাধীনতার পথ, আর নারী হবে রাষ্ট্রের উন্নয়নের অংশীদার। বিএনপির নারী-বান্ধব রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা তাই প্রতিশ্রুতির সংখ্যা নয়; বরং আগামী দিনের বাংলাদেশে একজন তরুণী কতটা নিরাপদ, কতটা স্বনির্ভর এবং কতটা স্বাধীনভাবে নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নিতে পারছেন, সেই উত্তরেই।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।