চট্টগ্রামের মানুষের স্বপ্নের ‘কালুরঘাট–চাক্তাই সড়ক ও বাঁধ প্রকল্প’ এখন জনদুর্ভোগ আর দুর্নীতির এক বিষফোড়ায় পরিণত হয়েছে। ২০১৮ সালে ১,৮৯৮ কোটি টাকায় অনুমোদিত এই প্রকল্পের ব্যয় বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২,৭৭৯ কোটি টাকায়। কিন্তু ব্যয় বাড়লেও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অনিয়ম। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের পকেট ভারী হলেও কাজের অগ্রগতি ও মান নিয়ে উঠেছে চরম প্রশ্ন।
সিন্ডিকেটের কবলে মেগা প্রকল্প: নেপথ্যে যারা
অনুসন্ধানে এই হরিলুটের নেপথ্যে একটি শক্তিশালী ত্রয়ীর নাম উঠে এসেছে। তারা হলেন— প্রকল্প পরিচালক রাজীব দাশ, উপকরণ তদারক কর্মকর্তা জসিম এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের প্রতিনিধি অসীম কুমার বাবু।
অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রটি সরকারি নীতিমালা তোয়াক্কা না করে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করছে। রাস্তার নিচে মরিচাধরা লোহার পাইপ, কাদা ও পলিথিন মিশ্রিত বালু এবং নিম্নমানের রড-পাথর দিয়ে দায়সারাভাবে কাজ চালানো হচ্ছে। এমনকি সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেলে তড়িঘড়ি করে সাইট থেকে নিম্নমানের উপকরণ সরিয়ে ফেলারও অভিযোগ করেছেন স্থানীয় শ্রমিকরা।
নকশা জালিয়াতি ও জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ
প্রকল্পের নকশা পরিবর্তন করে কালভার্টের পরিবর্তে সরাসরি ড্রেনেজ পাইপ বসানোর ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো এলাকা তলিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা মো. মুন্না আক্ষেপ করে বলেন, “উন্নয়ন হবে ভেবেছিলাম, কিন্তু এখন শুধু ধুলা আর পানির নিচে আমাদের বসবাস।” অথচ বিল-ভাউচারে প্রকৃত কাজের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থ উত্তোলন করে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আদালতের আদেশ বৃদ্ধাঙ্গুলি: ক্ষতিপূরণে বেপরোয়া লুটপাট
২০২৫ সালের ২১ এপ্রিল হাইকোর্ট (সিভিল রিভিশন নং ৬৮৬/২০২২) এই প্রকল্পে স্থিতাবস্থা বজায় রাখা ও ক্ষতিপূরণ বিতরণ স্থগিতের আদেশ দেন। কিন্তু আদালতের এই নির্দেশকে তোয়াক্কা না করেই গোপনে টাকা বিলি করছে সিডিএ-র অসাধু চক্র।
সরকারি ‘অধিগ্রহণ আইন ২০১৭’ অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্তদের বাজারমূল্যের চেয়ে ৩০০ শতাংশ বেশি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে চলছে কমিশন বাণিজ্য। জসিম ও অসীম সিন্ডিকেটকে নির্দিষ্ট ‘ভাগ’ না দিলে ফাইল আটকে রাখা হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষ ২–৩ লাখ টাকা পেলেও প্রভাবশালীরা হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। এমনকি আত্মীয়স্বজনের নামে ভুয়া খতিয়ান তৈরি করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের প্রমাণও মিলেছে।
আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ: রাজীব দাশের ‘সাম্রাজ্য’
প্রকল্প পরিচালক রাজীব দাশের বিরুদ্ধে উঠেছে রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থ পাচারের গুরুতর অভিযোগ। পটিয়ার বাসিন্দা রাজীব সাবেক সংসদ সদস্য ও হুইপ শামসুল হক চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি চট্টগ্রাম ও বিদেশে বিপুল সম্পদ গড়েছেন।
বিদেশে অর্থ পাচার: ভারতে বিপুল অর্থ পাচার ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগের গুঞ্জন রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অবৈধ সম্পদ: ঘোষিত আয়ের বাইরে একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট এবং ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকানা এখন তার নামে।
শাস্তি কী হতে পারে?
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি অর্থ আত্মসাতের দায়ে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন ২০০৪-এর ২৬ ও ২৭ ধারা অনুযায়ী অবৈধ সম্পদ অর্জন ও গোপন করা কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ইতোমধ্যে দুদকে এই চক্রের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে।
কর্তৃপক্ষের নীরবতা
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রকল্প পরিচালক রাজীব দাশ ও কর্মকর্তা জসিমের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তারা ফোন ধরেননি।
চট্টগ্রামের সচেতন মহলের দাবি, অবিলম্বে এই প্রকল্পের অনিয়ম তদন্তে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হোক এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হোক। অন্যথায় রাষ্ট্রীয় সম্পদের এই অপচয় চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ উন্নয়নকেই হুমকির মুখে ফেলবে।

