সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির প্রসঙ্গ এলে যে প্রতিষ্ঠানের নাম সবার আগে উঠে আসে তা হলো বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। এই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে নিম্নপদ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পদধারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ বহু পুরনো। আ.লীগ সরকারের আমলে এই প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির ভয়াবহরূপ দেখেছিল দেশের মানুষ। তেমনি সারা-দেশে বিআরটিএ’তে একটি বড় চক্র দীর্ঘদিন হরিলুটের নেতৃত্ব দিয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম ভূমিকায় ছিলেন বিআরটিএ চট্টগ্রাম মেট্রো সার্কেল-২ এর উপ-পরিচালক (ইঞ্জি:) মো: সানাউল হক।
বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, তিনি সিলেট ও ঢাকায় সহকারী-পরিচালকের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সেবাপ্রার্থীদের থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে পাচার করেছেন বিদেশে। তার গ্রামের বাড়ীতে কিনেছেন বহু জায়গা-জমি, ঢাকা শহরে কিনেছেন একাধিক ফ্ল্যাট, স্ত্রী ও তার আত্মীয় স্বজনের নামে ব্যাংকে রেখেছেন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। হয়েছেন অঢেল সম্পদের মালিক, বিআরটিএ’তে চাকরি করে পেয়েছেন আলাদীনের চেরাগ। আর সেই চেরাগ নিয়ে তিনি এখন বিআরটিএ’র বাদশা বনেছেন।
জানা গেছে, স্বৈরাচারী সরকারের পতন হলেও বহাল তবিয়তে আছেন দুর্নীতির এই বরপুত্র স্বৈরাচারের দোসর মো: সানাউল হক। তার বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ। দুদক ও আছে গভীরঘুমে।
বিআরটিএ সূত্র আরও জানায়, সেবাপ্রার্থীদের পকেট কেঁটে ওবায়দুল কাদেরের ব্যক্তিগত তহবিল গঠনে বড় ভূমিকা রেখেছেন এই সানাউল হক। এই সিণ্ডিকেটের অন্য সদস্যদের মধ্যে প্রভাবশালী সদস্য হিসেবেও তার নাম সবার মুখে মুখে। এই চক্রের বিরুদ্ধে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিল অনেক ভুক্তভোগী। কিন্তু সেখানেও প্রভাব কাটিয়ে টাকা আর আধিপত্যের কারণে সে তদন্তও ধামাচাপা দেন এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা গেছে—চট্টগ্রাম বালুছড়া বিআরটিএ কার্যালয়ে উপ-পরিচালক (ইঞ্জি.) মো. সানাউল হক যোগদানের পর অনিয়ম-দুর্নীতির মাত্রা এতটায় বেড়েছে তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বলার সাহস পাচ্ছে না। তিনি এতটাই বেপরোয়া ঘুষ আর দালাল ছাড়া কিছুই বুঝেন না। টাকা না দিলে সেবা প্রার্থীদের নানা অজুহাতে হয়রানি করছেন তিনি। আর টাকা দিলেই সবকিছু এক নিমেষেই সমাধান দিচ্ছেন সানাউল। তার এই চাকরি জীবনে দীর্ঘদিন অনিয়ম-দুর্নীতির বরপুত্র হিসেবেও বিআরটিএ’তে স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই সানাউল হকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ভয়াবহতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ইতিপূর্বে তিনি যখন বিআরটিএ সিলেট কার্যালয়ে সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন, তখনও তার বিরুদ্ধে বিস্তর দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। তখন তিনি সিলেটে বিশাল দালাল সিণ্ডিকেট গড়ে তুলে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা হাতিয়েছেন।
বিআরটিএ সুত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামেও অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে দালাল চক্রের সিণ্ডিকেট গড়েছেন তিনি। ড্রাইভিং লাইসেন্স, নবায়ন, যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন ও রুট পারমিট নিয়ে অসংখ্য অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে এই সানাউল হকের বিরুদ্ধে। এসব অনিয়ম করে চট্টগ্রাম বিআরটিএ থেকে তিনি প্রতিমাসে কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, নিয়ম অনুযায়ী অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য ১০ হাজার এবং পেশাদারদের জন্য ১২ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে সানাউলের নিদিষ্ট দালালদের। রেজিস্ট্রেশন কিংবা ফিটনেসসহ প্রতিটি সেবার জন্য সেবাপ্রার্থীদের নির্ধারিত ফি’র বাইরে গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। এবং চোরাই গাড়ির মালিকানা পরিবর্তন, মোটরসাইকেল পরিদর্শন না করেই রেজিস্ট্রেশন এবং গাড়ি না দেখেই ফিটনেস সার্টিফিকেট দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে এই চক্রের বিরুদ্ধে।
তথ্য সূত্রে জানা গেছে, এর আগে সিলেট ও মিরপুর কার্যালয়ে ছিলেন সানাউল হক। সেখানেও তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ ছিল। সিলেটে শ্রমিক অসন্তোষের মুখে তাকে প্রত্যাহার করা হলেও চট্টগ্রামে এসে তিনি আরও শক্তিশালী দালাল সিণ্ডিকেট গড়ে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।
ভুক্তভোগী ও পরিবহন মালিকদের সূত্রে জানা গেছে, বিআরটিএ-তে প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা আলাদা ঘুষের হার নির্ধারিত আছে। যেমন— রুট পারমিট ও ফিটনেস বাস ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা, হিউম্যান হলার ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা, ট্রাক-ড্রাম ট্রাক ২ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা, অটোরিকশা ৪০০ টাকা। ড্রাইভিং লাইসেন্সে অতিরিক্ত ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা। নম্বরপ্লেটে নির্ধারিত ফি’র বাইরেও অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছেন সানাউল হকের নির্ধারিত দালাল চক্র।
সম্প্রতি— ২০২২ সালে সানাউল হকের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে চলা এই লাগামহীন দুর্নীতি ও দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধের দাবিতে আন্দোলনে নামে ‘সিলেট জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ঐক্য পরিষদ’। এক পর্যায়ে শ্রমিকরা পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দিলে ব্যাপক জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে এবং দালালদের মদদ দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তৎকালীন সময়ে তাকে সিলেট থেকে তাৎক্ষণিক বদলি করা হয়েছিল।
তবে চট্টগ্রামে আসার পর তিনি পুনরায় তার অনুগত সিণ্ডিকেটের মাধ্যমে একই ধরনের অনিয়ম ও হয়রানির সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন। তাদের অভিযোগ, ড্রাইভিং লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন, রুট পারমিটসহ যেকোনো সেবা পেতে হলে দিতে হয় মোটা অঙ্কের ঘুষ। অফিসের বাইরে প্রকাশ্যে অবস্থান করা তার দালাল চক্র ছাড়া এখানে কোন সেবা পাওয়া যায় না।
উপরোক্ত বিষয়ে বিআরটিএ চট্টগ্রাম মেট্টো-২ সার্কেলের উপ-পরিচালক (ইঞ্জি:) সানাউল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগের বিষয়ে নিউজ না করতে প্রতিবেদকে অনুরোধ করেন, এবং নিউজ আটকাতে বিভিন্ন মাধ্যমে তদবির করেন।
সানাউলের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে চট্টগ্রাম বিআরটিএ ডিডি মাসুদুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেনি।

